ঢোকা-বেরোনোর পথটি পন্ডিতমশাইয়ের বৈঠকখানার সামনে দিয়ে। সেখানে তর্করত্ন মহাশয় দু'বেলা আড্ডা বসান তাঁর সমকক্ষ বন্ধুদের সঙ্গে – কাব্যতীর্থ, ব্যাকরণাচার্য্য, সিদ্ধান্তবাগীশ, তর্কপঞ্চানন, বিদ্যাভূষণ প্রমুখ। এঁদের মধ্যে কে বড়, এই নিয়ে রেষারেষি লেগেই থাকে। এখানে তর্করত্ন মহাশয় একটু বেকায়দায় থাকেন, কারণ তিনি নিজে দিকপাল পন্ডিত হলেও তাঁর ছেলেটিকে একবার নাম সই করতে বললে সে তিনটি পেন্সিল ভেঙে ফেলে। সুতরাং এই জ্ঞানসমুদ্রের সামনে দিয়ে গোপাল যখন ঢোকে আর বেরোয় তখন এই সব সমকক্ষরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দীর দুর্ভাগ্যে মনে মনে উৎফুল্ল হ'ন এবং মুখে কপট দুঃখ প্রকাশ করে পন্ডিতমশাইকে ঠেস দিতে ছাড়েন না।
”বাবা গোপাল, তোমার পিতাঠাকুর এত বড় একজন পন্ডিত, কিন্তু তুমি বাবা সেই মূর্খই থেকে গেলে? বড় আফশোসের কথা।"
"বাবা গোপাল, তোমার বাবার কাছে সন্ধেবেলা বসে একটু কলাপ ব্যাকরণটা যদি অন্ততঃ প্রতিদিন দু'পাতা করে…"
"বাবা গোপাল, একজন মহামহোপাধ্যায়ের একমাত্র পুত্র কাঁধে লাঙল নিয়ে চাষ করতে যায়, দেখে বড় খারাপ লাগে। লঘুকৌমুদীটা যদি আরেকবার বাবার কাছে…"
পিতৃস্থানীয়দের তিরস্কার গোপাল মাথা নিচু করে শোনে, তার পরে ধীরে ধীরে মাঠের দিকে হাঁটা দেয়, বা ফেরার সময় হলে ঘরে ঢুকে যায়। গুরুজনদের কথার জবাব না দেওয়ার বোধটুকু অন্ততঃ তার আছে। কিন্তু তিল তিল করে বিরক্তি জমা হয় তার মনের ভেতরে। এই সব যখন ঘটে, তর্করত্ন মহাশয় তখন মুখ চুন করে বসে থাকেন। বাগ্মী হিসেবে খ্যাতিমান হলেও এই একটা সময়ে তাঁর বলার কিছু থাকে না।
এইভাবে বেশ কয়েক বছর চলে। গোপালের সংসার বৃদ্ধি পায়। তার মেজাজও এখন আর অতটা মোলায়েম নেই, কারণ নিয়মমতো যদিও পন্ডিতমশাই এখনও সংসারের কর্তা, তাঁর বয়স আশি ছাড়িয়েছে। আসলে গোপালই এখন সংসার চালায়। তার মধ্যে এখন একটা ভারিক্কে ভাব এসেছে। এই অবস্থায় রোজ গুরুজনের অযাচিত গঞ্জনা সহ্য করতে পারার কথা নয়। অথচ জ্ঞানসমুদ্রের কাছে সে খবর নেই। তাঁদের চোখে গোপাল সেই মূর্খ ছোকরাই রয়ে গেছে।
অতএব এক দিন গোপাল লাঙল কাঁধে বাড়িতে ঢুকছে, এমন সময় সিদ্ধান্তবাগীশ বলে উঠলেন – "বাবা গোপাল, এ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না বাবা। এত বড় একজন দিগ্গজ আচার্য্য তোমার পূজনীয় পিতাঠাকুর, আর তুমি কি না বাবা… আচ্ছা, তোমার বাবার কাছে বসে একবার অন্ততঃ গীতার সহজ অধ্যায়গুলি যদি…"
এত দিন পরে গোপালের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল। ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে পন্ডিতসভার দিকে আঙুল তুলে বেশ ধমকের সুরে খুব দ্রুত বলে উঠল –
"ধষেনি নমগনামগ যাদি রপৌরনে ইলা কেরেতিব্য মরফটপ্ল্যাঃ!"
বলে আর একটুও না দাঁড়িয়ে গটমট করে ভেতরে চলে গেল।
মেশিন গানের গুলি চললে যেমন লোকে মাথা নিচু করে দু'হাত তুলে ঠেকানোর অবাস্তব চেষ্টা করে, পন্ডিতেরা তেমন ভঙ্গিতে শব্দগুলো ঠেকাতে চেষ্টা করলেন। গোপাল চলে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ সবাই হতবাক। সবচেয়ে অবাক হয়েছেন গোপালের বাবা। প্রথম কথা ফুটল কাব্যতীর্থের মুখে – "বাপ রে!"
তার পরে একে একে সবাই ধাতস্থ হয়ে গবেষণায় বসলেন।
তর্কপঞ্চানন: "হ্যাঁ হে তর্করত্ন, গোপালকে সংস্কৃত শিখিয়েছ, ঘুণাক্ষরেও তো জানতে দাওনি?"
তর্করত্ন: "বিশ্বাস করুন দাদা, আমি একটি অক্ষরও…"
সিদ্ধান্তবাগীশ: "রাতের দিকে নিয়ে বস বুঝি?"
তর্করত্ন: "আরে না না, আমি এ ব্যাপারে কিছুই…"
কাব্যতীর্থ: "তা এটা কি শূদ্রক থেকে বলল? কালিদাসের ভাষা তো এতটা কর্কশ হবে না। শূদ্রক নিশ্চিত। আর নইলে বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা।"
ব্যাকরণাচার্য্য: "কিন্তু অর্থ কী? ভাই বিদ্যাবিনোদ, একটু বুঝিয়ে বলো না।"
বিদ্যাবিনোদ: "কী জানি দাদা, আমার তো মনে হলো ব্যাকরণের কোনো সূত্র হবে। আপনিই ভালো বলতে পারবেন।"
ব্যাকরণাচার্য্য: "হ্যাঁ, চেষ্টা করলে পারব না কেন, নিশ্চয়ই পারব, শুধু ঐ প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা একটু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যেন পড়েছিলুম? বলো না হে সাংখ্যতীর্থ, কপিলমুনি প্ল্যাঃ সম্পর্কে কী বলেছেন?"
সাংখ্যতীর্থ: "আজ্ঞে কপিলমুনি প্ল্যাঃ প্রত্যয় বিষয়ে কিছুই বলেননি। এটা রয়েছে ত্রিমুনি ব্যাকরণের কাত্যায়নকৃত অংশে। আপনি বরং তর্করত্ন দাদাকেই জিজ্ঞেস করুন। পাণিনি-কাত্যায়ন-পতঞ্জলী ওঁর কন্ঠস্থ। তা ছাড়া শিক্ষা যখন উনিই দিয়েছেন…"
তর্করত্ন: "বিশ্বাস করুন মহোদয়গণ, আমি এ ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ… আর প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা আমারও যেন কেমন একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে। পড়েছিলুম ছোটবেলায় ঠিকই…"
অতঃপর সকলে মিলে সিদ্ধান্ত হলো যে গোপাল রাত জেগে বাবার কাছে লেখাপড়া শেখে। বন্ধুদের চমকে দেওয়ার জন্য সে কথা তর্করত্ন কখনো প্রকাশ করেননি।
আড্ডার শেষে পন্ডিতমশাই গোপালকে ডেকে রহস্যটা জানতে চাইলেন। গোপাল একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে স্থানত্যাগ করল। বাধ্য হয়ে পন্ডিতমশাই পুত্রবধূর শরণাপন্ন হলেন।
"ব্যাপারটা একটু দেখ তো মা। বন্ধুদের সামনে আজ আমার খুব মুখোজ্জ্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এত সব ও শিখল কোথায়? বিশেষ করে প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা কোথায় আছে যদি একটু জেনে দিতে পারো… কাল ওদের একটা জবাব তো দিতে হবে।"
রাতে শয়নকক্ষে গোপাল কঠিন জেরার মুখে পড়ল। বাপ-কাকাকে এড়িয়ে পালানো সম্ভব। বিছানা থেকে পালাবে কোথায়? কিছুক্ষণ অত্যাচার সহ্য করে সে বলতে বাধ্য হল।
"সকাল থেকে মোষের মতো খাটি, সে তো তোমাদেরই জন্য? সন্ধেবেলা দুটি জলভাত খেয়ে শুয়ে পড়ি, মড়ার মতো ঘুমোই। এর মধ্যে পড়ব কখন বল তো? কিছু না, শোনো আসল কথা। দু'মাস আগে তুমি বায়না ধরলে বাপের বাড়ি যাবে। তো আমাকেও যেতে হলো পৌঁছে দিতে। ফেরার সময় ট্রেন লেট। কোথায় না কি তার ছিঁড়েছে। পাক্কা দু'ঘন্টা স্টেশনে বসে বিড়ি ফুঁকছি আর মশার কামড় খাচ্ছি। মনটা বিরক্তিতে তেতো হয়ে আছে। পড়াশোনাও বিশেষ একটা জানি না যে খবরের কাগজ কিনে পড়ব। তখন দেখি একটা ফলকের গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে:
*প্ল্যাটফরম ব্যতিরেকে লাইনের উপর দিয়া গমনাগমন নিষেধ।*
কিছু করার ছিল না, তাই দু'ঘন্টা ধরে ওটাই উল্টো দিক থেকে মুখস্থ করে ফেললাম। কোনো কাজে লাগার কথা ছিল না, কিন্তু আজ মারাত্মকভাবে কাজে লেগে গেল। শুধু শেষে একটা বিসর্গ যোগ করে দিয়েছিলাম, যেমন সংস্কৃত ভাষায় অনেক শব্দের শেষে থাকে। কিছু জানি না, কিন্তু ছোটবেলা থেকে কানের কাছে শুনে তো আসছি!"
গল্পটা ছোটবেলায় শুনেছিলাম বাবার কাছে। একজনকে পড়ানোর জন্য আজ লিখলাম।