Saturday, 4 January 2025

তারানাথের প্রত্যাবর্তন

তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প সব রেডিও এবং ইউটিউবে হয়ে গেছে। কিন্তু শ্রোতারা আরও চাইছেন। একটা অনলাইন অনুষ্ঠানে অসাবধানতাবশতঃ মীরের কাছে কবুল করে ফেললাম যে নতুন তারানাথ লিখব। অগত্যা লিখতে হলো। প্লট অনেক দিন ধরেই আছে, কিন্তু এই চাপে না পড়লে কুঁড়েমি কাটিয়ে উঠে লেখা হতো না।

আজ শনিবার, ৪ঠা জানুয়ারি, ২০২৫, রাত ৯টায় মীরের ইউটিউব চ্যানেলে গল্পটা শোনা যাবে "ভন্ড তারানাথ" নামে। পেপারব্যাক বেরোনোর কথা এই ব‌ইমেলায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে। ব‌ইয়ের নাম "তারানাথের প্রত্যাবর্তন"।

লেখাটির কিছু কিছু অংশ এখানে দিচ্ছি।

সাধু বললেন, ‘বেটা, তুই তো কিছুটা সাধনা করেছিস। এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিস যে এই পশুপাখি, গাছপালা, আকাশ-মাটি-পৃথিবী আর রক্তমাংস দিয়ে গড়া যে দুনিয়াটাকে আমরা বাস্তব মনে করি, সেটা আসলে একটা মায়া। এর পেছনে আরেকটা জগৎ আছে যার একটা ক্ষীণ ছায়া আমাদের এই পৃথিবী। আসল ঘটনাগুলো ঘটে সেইখানে, আর তার প্রতিফলন আমরা আমাদের জগতে দেখতে পাই। যে সব মহাশক্তিধর অস্তিত্ব আড়াল থেকে আমাদের জীবন পরিচালনা করেন, তাঁরা সেই অন্য জগতে মূর্তিমান হয়ে ঘুরে বেড়ান। কোনো কোনো সময় আমরা সেখানকার দুই-এক ঝলক দেখতে পাই – সাধারণতঃ স্বপ্নের মধ্যে। কিন্তু সেখানে স্বেচ্ছায় কিছু করতে পারি না, মনে হয় কলের পুতুলের মতো যেন কার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি। আমি তোকে শেখাচ্ছি সাধনা ও মন্ত্রের সাহায্যে যোগনিদ্রার মধ্যে দিয়ে কী ভাবে ইচ্ছামতো সেই জগতে প্রবেশ ও বিচরণ করা যায়। আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতে কী ঘটছে, কেন ঘটছে তার রহস্য ওখানে গেলে অনেক সময় বোঝা যায়। প্রথম আবেশটা আমি তোকে করিয়ে দিচ্ছি। তার পরে সাধনায় যদ্দুর যেতে পারিস। আয় এদিকে।

[…]

ময়নাডিহি খালের কাছাকাছি মানুষের বাস নেই – শুধু জঙ্গলের মধ্যে বুনোদের দুই-একটা কুঁড়ে ঘর। গাছপালা দিয়ে ঢাকা ছায়াচ্ছন্ন এলাকা। বৈশাখ-জৈষ্ঠের চড়া রোদেও এখানকার মাটিতে আলো পৌঁছোয় না। কাছাকাছি গ্ৰামের শিশু ও কিশোররা এ দিকটা এড়িয়ে চলে। আমার ছোটবেলাতে মনে আছে মা বারণ করতেন এদিকে আসতে, কারণ জায়গাটা নাকি ভালো না। কেন ভালো নয় তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা কখনও শুনিনি। তবে ময়নাডিহি খালের জলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বেশ কয়েক বার। সেগুলো সব দুর্ঘটনা, না খুন, না আত্মহত্যা, তার নিশ্চিত ফয়সালা হয়নি কখনও।

[…]

মন্ত্রের জোরে প্রাণে মরব না জানি। কিন্তু মানসিক সুস্থতা বা বাকি জীবনটা ঘুমোতে পারার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার কোনো মন্ত্র আছে বলে শুনিনি কখনও। তবু এ রহস্য ভেদ না করে আমার উপায় নেই। পকেট থেকে দেশলাই বের করে একটা কাঠি জ্বেলে ছায়ামূর্তির মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। অন্য হাত দিয়ে তার ঘোমটা দিলাম সরিয়ে। সে আপত্তি করলো না।

[…]

এই সময় আমি টের পেলাম আমার একটা মৃদু অস্বস্তি হচ্ছে। তোমরা জানো মধুসুন্দরী দেবীর কৃপায় আমি কিছু ক্ষমতা পেয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা হলো, অতিপ্রাকৃতের উপস্থিতি আমি অনুভব করতে পারি, এবং সেই সংক্রান্ত কোনো অমঙ্গলের আগাম সঙ্কেত পাই। ভেবে দেখলাম, শ্যামাপদ যখন বলল ‘ফের এসেছিস’, তখন থেকেই এটা হচ্ছে। অনেকেরই এই অনুভূতিশক্তি সহজাত ভাবে থাকে, কিন্তু খুব কম মানুষই এর চর্চা করে। তোমার পেছন থেকে কেউ যদি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে, পাঁচটা সাধারণ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পাওয়ার কথা নয়। তবু যদি তুমি সংবেদনশীল হ‌ও, তোমার ঘাড়ের কাছটা শিরশির করবে, মেরুদন্ড বেয়ে একটা তরঙ্গ বয়ে যেতে থাকবে। কেন? কারণ এই মহাবিশ্বের রহস্য যদি হয় সমুদ্রের মতো অপার, তবে তার মধ্যে তোমাদের ইংরেজি বিজ্ঞান হলো এক ফোঁটা জলের সমান। বাড়িতে ঢোকার সময় থেকেই আমার মনে হচ্ছিল আড়াল থেকে কেউ আমাকে দেখছে। দেবীর বরে আমার এই বোধ খুব তীক্ষ্ণ, আজ পর্যন্ত ভুল হয়নি। এর কী ব্যাখ্যা দেবে তোমাদের বিজ্ঞান?

[…]

সত্যযুগে নচিকেতা যমরাজকে প্রশ্ন করেছিলেন, মৃত্যুর পরে মানুষ কোথায় যায়, আত্মার কি আদৌ অস্তিত্ব আছে? যম বলেছিলেন, নচিকেতা তুমি অন্য কিছু চাও। আমি তোমাকে অফুরন্ত সম্পদ দেব, ক্ষমতার শীর্ষে প্রতিষ্ঠা করব, পৃথিবীর রাজা করে দেব, অতিদীর্ঘ আয়ু দেব, সবরকম শারীরিক সুখ দেব। শুধু ঐ কথাটি জানতে চেয়ো না। কারণ জন্মমৃত্যুর রহস্য শুধু মানুষ নয়, আমি ব্যতীত অন্য সকল দেবতারও অজানা। সৃষ্টির সেই আদি যবনিকা, যার ওপারে তাকানোর অধিকার দেবতাদের‌ও নেই, দুটো আবোলতাবোল অং বং শিখে সেই পর্দা সরিয়ে দেখতে চেয়েছি কলিযুগে আমি তারানাথ চক্রবর্তী।

[…]

পাখি তারা নয়, কারণ তাদের দেহ ও ডানা বাদুড়ের মতো, চামড়ার তৈরি, এবং মাথাটা মানুষের। মানুষের বলতে দ্বিধা হচ্ছে, কারণ তাদের মুখে চোখে যে ভয়াবহ ক্রূর স্বার্থপরতা প্রকাশ পাচ্ছে তা কোনো মানুষের অভিব্যক্তি হতে পারে না, যত বড় নৃশংস শয়তান সে হোক না কেন। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা ঘাড় বেঁকিয়ে আমাকে দেখছে ও মাঝে মাঝে এক ধরণের তীব্র শব্দ করছে। রেলগাড়ির হুইস্‌লের আওয়াজ যদি এক সপ্তক চড়িয়ে দাও তা হলে যে রকম শোনাতে পারে অনেকটা সেই রকম।

[…]

দেখলাম কালো পাঁকের একটা অংশ ফুলে উঠছে। যেন একটা বিরাট বড় বুদ্বুদ এক্ষুনি উঠে এসে ফাটবে। কিন্তু বুদ্বুদ নয়। ক্রমশঃ কাদার একটা স্তম্ভ একটা মানুষের সমান উঁচু হয়ে দাঁড়ালো। তার পরে সেই আলকাতরার মতো ঘন কালো আঠালো পদার্থটা তার গা থেকে যত গড়িয়ে পড়তে থাকল, তত ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা মানুষের আকৃতি। এবং আমি তাকে চিনতে পারলাম।

[…]

এই কথাটা ভাবামাত্র মাথার ভেতরে যেন একটা বিদ্যুৎচমক খেলে গেল। নেপালী সাধু কেন স্বপ্নচারণ শিখিয়েছিলেন, বোষ্টম-বৌ কিসের অশনি-সঙ্কেত দিতে এসেছিল, শ্যামাপদ কেন ঐ কথাগুলো বলেছিল, এবং পাপাত্মাদের আসল উদ্দেশ্য, সব‌ই এক মুহুর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল। সেই সঙ্গে শৈশব থেকে সেই যে একটা প্রশ্ন আমার ছিল – বাবার চাবিটা দিয়ে কী খোলে – তার‌ও উত্তর পেয়ে গেলাম। এবং এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা পথ‌ যেন দেখতে পেলাম। এই পরাবাস্তবের রাজ্যেই আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে, এক্ষুনি।

No comments:

Post a Comment