Tuesday, 2 September 2025

ভূতের সপ্তর্ষি দেখা

পুরনো কাগজ বাছতে গিয়ে একটা পত্রিকা পেলাম। নাম "অন্য কথা"। পলতা থেকে বেরোত, বছরে একটা, সম্পাদক শ্রী দীপক মিত্র। ওতে কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। ২০০১ সালের সংখ্যাটা খুঁজে পেলাম। পড়ে বেশ মজা লাগল – কেমন লিখতাম তখন। গুগ্‌ল লেন্স দিয়ে টেক্সট নিষ্কাশন করে এখানে দিলাম। এই সপ্তর্ষি চরিত্রটা নিয়ে আর‌ও কয়েকটা লিখেছিলাম। যদি কখনও খুঁজে পাই, এখানে দেব। এই গল্পটার নাম "ভূতের সপ্তর্ষি দেখা"।


ভূতের সপ্তর্ষি দেখা
=============
তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা চাপা আতঙ্ক বুকে নিয়ে সপ্তর্ষির দিবানিদ্রা ভেঙে গেল।

কেউ বা কারা তাকে দেখছে।

ঘুমের আবেশ একটানে সরিয়ে দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসল। নাঃ, কেউ নেই তো! তার নিজের শোওয়ার ঘর, যেমনকার ঠিক তেমনই। এ ঘরে লুকোনোর জায়গা নেই একটুও। খাটের নীচেটায় ঠাকুমার আমল থেকেই সস্তা কৌটো-বাটার রাজত্ব। ওগুলোর মধ্যে কী আছে কেউ কোনোদিন খুলেও দেখে না। অথচ ওগুলো খুব দরকারি, এ রকম একটা অস্পষ্ট ধারণা বাড়ির লোকেদের মনে রয়েছে। সপ্তর্ষিও মনে করে, কখন‌ও খুব আকাল পড়লে কিছু দুষ্প্রাপ্য তৈজসপত্র এখান থেকে উদ্ধার হতে পারে।

কিন্তু যতই জঞ্জালে ভর্তি হোক, কেউ কি চেষ্টা করলে ওখানে ঢুকে বসে থাকতে পারে না? এই ভেবে সপ্তর্ষি নীচু হয়ে খাটের তলায় দেখতে চেষ্টা করল।

কেউ নেই।

কিন্তু একটু অগোছালো লাগছে কি? ভাবতেই হাসি পেল ভয়ের মধ্যেও। অগোছালো লাগছে এই জায়গাটা? খুব গোছানো ছিল কি না!

তবু কী যেন একটা সমস্যা রয়ে গেছে? যেখানকার নোংরা কৌটো সেখানেই অবহেলিত হয়ে আছে, অথচ মনে হচ্ছে পুরো জিনিসটা যেন এইমাত্র কেউ নেড়েচেড়ে বসিয়ে দিল। সিনেমায় 'একটি নোংরা ও জঞ্জালময় খাটের তলা' দৃশ্যের সেট হুবহু প্রস্তুত। অন্য সময় এই জায়গাটা থাকে নেহাৎই ফালতু ও অপরিষ্কার, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অতি সন্তর্পণে কেউ এটাকে ফালতু ও অপরিস্কার করে তুলেছে। মাকড়সার জালগুলো এমন ভাবে হাতে টেনে-টেনে লাগানো, যাতে কেউ একটুও সন্দেহ না করতে পারে।

আর অপটু হাতে করতে গিয়ে অথবা পটুত্বের অহংকারে জিনিসগুলো বড্ড বেশী স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কোনো-কোনো চালাক দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিনেতা যেমন মঞ্চে স্বাভাবিকত্ব আনতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়, সেরকম ভাবে এগুলো এত মারাত্মক সাধারণ যে চোখের পড়ার মত হয়ে উঠেছে।

তার ঘরে কেউ এসেছিল এইমাত্র।

অথবা এখনো কেউ আছে।

সপ্তর্ষির গায়ে কাঁটা দিল। তাড়াতাড়ি জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কাউকে দেখা যায় কি না।

সাধারণ গলিটাই তাদের বাড়ির সামনের। বিজনবাবু রোজকার মত বিরক্ত মুখে বাজার যাচ্ছেন। জামরুলগাছে কাকটা বসে সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে আছে। সপ্তর্ষি ভাবল, তাহলে কি এ-ই? শেষ পর্যন্ত ওরা কাক পাঠালো নজরদারি করার জন্য? নাঃ। ওর মধ্যে সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি কোথায়? ওর চাউনি তো কালো পুঁতির মতো, ভাবলেশহীন।

ঘাড়ের ঠিক পেছনে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ হল।

প্রচণ্ড চমকে ও পেছন দিকে ঘুরতেই কে বা কারা যেন চোখের পাশ দিয়ে সাঁৎ করে সরে গেল।

“কে? কে? কোথায় গেল?” সপ্তর্ষি প্রবল বেগে ঘরের চারদিকে দেখতে লাগল। কিন্তু কোথায় দেখবে? তার ঘরে তো লুকোনোর জায়গা নেই কোনো।

তবে কি মনের ভুল? ঘুম কাটেনি এখনো? হতেও পারে। আর সত্যিই তো, তার ঘরে চুরি করার মত কিছু নেই। তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও খুবই সাদামাটা। এমন কোনো বিষয় নেই যার জন্য গোয়েন্দা লাগানো যেতে পারে অথবা যার থেকে গল্পের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।

আজ বিকেলে অবশ্য ঘুম থেকে উঠেই একটা ভূত-ভূত খেলা শুরু হয়েছে। পরিবেশে একটা নাটকীয়তা রয়েছে, যেন সে আসলে সাধারণ ছেলে সপ্তর্ষি নয়, কোনো গল্পে সাধারণ ছেলে সপ্তর্ষির ভূমিকায় অভিনয় করছে। আর তার সঙ্গে এই একটা অনুভূতি, যে তার মাথার ফুট দুয়েক পেছন থেকে কে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

অসহ্য।

দুই-একবার সে বাঁই-বাঁই করে পাক খেয়ে দেখার চেষ্টা করল, ধরা যায় কি না। কোন লাভ হল না। কিন্তু প্রত্যেকবারই মনে হল, কালোমত কী একটা জিনিস পিছলে সরে গেল।

সপ্তর্ষির এবারে খুব রাগ হল। এ কী অন্যায় কথা! তাকে দেখা হচ্ছে, অথচ সে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না! এটা ঠিক নয়। কিন্তু কার কাছে নালিশ করবে, এ বিষয়ে অথারিটি কে, ঠাওর না করতে পেরে গোমড়ামুখে সে একতলায় নামল।

মুখে গোমড়া ভাব আর মনে চাপা ভয় নিয়ে যত নীচে নামল, তত তার অস্বস্তি আরও বেড়েই গেল। যতবার ঝটকা মেরে ঘাড় ঘোরাচ্ছে। ততবার দেওয়াল-দরজাগুলো যেন ধরা পড়ে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি নড়ে-চড়ে একেবারে সত্যিকারে দেওয়াল-দরজার মত হয়ে উঠছে। কজার ওপর খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। চমৎকার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন আসলটি।

কিন্তু এই ফাঁকি সপ্তর্ষি ধরে ফেলল। তার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। ভূতের গল্প ও রহস্য উপন্যাস পড়ে-পড়ে সে একেবারে তুখোড় হয়ে উঠেছে।

এই সময় অবিকল সপ্তর্ষির মা এসে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য ভাবে যে একজোড়া তালশাঁস সন্দেশ দিলেন, সেগুলোর মত কৃষ্ণনগরের কারিগরও বানাতে পারবে না। এমন কি, খেতেও হুবহু এক রকম।

বাহাদুরী আছে বটে। একটুও বোঝাবার উপায় রাখেনি।

কিন্তু ওদিকে বৈঠকখানায় তার বড়কা আর ছোটবেলা-থেকে-বোবায়-ধরা ছোটকা (ঠিক যেন বড়কা আর বোবায়-ধরা ছোটকা) দাবা খেলতে-খেলতে চমকে এদিক-ওদিক দেখছেন, এটাও অনস্বীকার্য্য। যেন হঠাৎ ভূত দেখেছেন অথবা ভূত ওঁদেরকে দেখেছে।

এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপার সপ্তর্ষির পছন্দ হল না। এ সব বাড়ির পক্ষে অমঙ্গলজনক হতে পারে। আর বাড়িসুদ্ধ লোক সব সময় তটস্থ হয়ে থাকবে, এ-ও তো ভাল কথা নয়। তা ছাড়া নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে, আর ব্যক্তিগত ব্যাপারে বাইরের লোক এসে নাক গলাবে, এটা কি ঠিক? একটা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।

এই প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হয়ে সে ঝটিতি এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, যে দিকে মোড় নেওয়ার কথা নয় সে দিকেই হঠাৎ করে চলে গেল, আর মাঝে-মাঝে ফুট দুয়েক পেছনে হেলে পড়ে ছায়াটাকে অপ্রস্তুত ও পর্যুদস্ত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল।

এবং এই পরিশ্রমসাধ্য চেষ্টা করতে করতে (যে সময়ে হুবহু তার বাড়ির লোকেরা অবিকল সন্দেহের চোখে সম্পূর্ণ সকারণে অত্যন্ত বিশ্বাস্য ভঙ্গিতে তার দিকে তাকাতে আরম্ভ করেছে) একবার ডান কাত হয়ে বাঁ দিকে চোখ নামাতেই কে যেন ভয় পেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।

এই বার যাবি কোথায়? বাথরুমের দরজা তো একটাই।

সপ্তর্ষি একটুও ভয় না পেয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল এবং টেনে বের করে নিয়ে এল। জিনিসটা যদিও খুব পেছল, সপ্তর্ষির কোনো অসুবিধে হল না। এই ধরণের জিনিস কী ভাবে সামলাতে হয়, সেই তুক তার শেখা আছে। কানের গর্তে বাঁকানো কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে এল। বেচারির আর ট্যাঁ-ফোঁ করার জো রইল না। এ রকম শক্ত পাল্লায় বোধ হয় পড়েনি আগে কোথাও।

"কী নাম তোর? আমাদের ওপর নজর রাখছিস কেন?"

কড়া চোখে তাকিয়ে বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন করতেই কালচে মত জীবটা তিড়িং-তিড়িং করে লাফায় আর নার্ভাস গলায় বলে চলে, "পা-পা-পা-পা-পা-পা-পা........."।

"কীসের পাপাপা? বদমায়েসী হচ্ছে? চল তোকে পুলিশে দেব, নয়তো ওঝা ডাকব।

শুনে তো পদার্থটা ভির্মি খায় আর কি!

কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর জিনিসটার বোধশক্তি ও স্মার্টনেসের নিতান্তই অভাব দেখে সপ্তর্ষি একটু দয়াপরবশ হল।

"আচ্ছা, এ বারের মত ছেড়ে দেব ঠিক করলাম। কিন্তু এ রকম না বলে-কয়ে লোকের ঘরে ঢুকে পড়াটা কি ঠিক?"

জিনিসটা তিড়িং-তিড়িং করে লাফায় আর আতঙ্কিত গলায় বলে "না-না-না-না-না-না-না-না।"

"ঠিক বুঝেছিস। আচ্ছা, যাঃ।"

অভদ্র জন্তুটা ছাড়া পেয়ে কুমড়োর মত গড়াতে-গড়াতে আর ঢেঁকির মত লাফাতে-লাফাতে উধাও হয়ে গেল।

"চিন্তার কিছু নেই,” সপ্তর্ষি ভিতরে ঢুকে এসে বোবায়-ধরা ছোটকাকে অভয় দিল। "বেটা আর এ-পথ মাড়াবে না। নাম বলল পাঠক না কী। কোথা দিয়ে ঢুকল কে জানে।"

তাও একবার দেখে নিতে হবে আনাচে-কানাচে দুই-একটা রয়ে গেল কি না। ঘরবাড়ি ইতিমধ্যেই অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে এসেছে। সপ্তর্ষি ঠিক করল, দিনকতকের জন্য নিজের চাল-চলন ও কথাবার্তা আরও দুর্বোধ্য ও অপ্রত্যাশিত করে তুলবে। যদি খুব সাহসী দুই-একটা এখনও আড়াল থেকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ও বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে এতেই নিরস্ত হবে। বেটাদের বুদ্ধির যে বহর দেখা গেল!


********
“অন্য কথা” / ২০০১

Saturday, 4 January 2025

তারানাথের প্রত্যাবর্তন

তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প সব রেডিও এবং ইউটিউবে হয়ে গেছে। কিন্তু শ্রোতারা আরও চাইছেন। একটা অনলাইন অনুষ্ঠানে অসাবধানতাবশতঃ মীরের কাছে কবুল করে ফেললাম যে নতুন তারানাথ লিখব। অগত্যা লিখতে হলো। প্লট অনেক দিন ধরেই আছে, কিন্তু এই চাপে না পড়লে কুঁড়েমি কাটিয়ে উঠে লেখা হতো না।

আজ শনিবার, ৪ঠা জানুয়ারি, ২০২৫, রাত ৯টায় মীরের ইউটিউব চ্যানেলে গল্পটা শোনা যাবে "ভন্ড তারানাথ" নামে। পেপারব্যাক বেরোনোর কথা এই ব‌ইমেলায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে। ব‌ইয়ের নাম "তারানাথের প্রত্যাবর্তন"।

লেখাটির কিছু কিছু অংশ এখানে দিচ্ছি।

সাধু বললেন, ‘বেটা, তুই তো কিছুটা সাধনা করেছিস। এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিস যে এই পশুপাখি, গাছপালা, আকাশ-মাটি-পৃথিবী আর রক্তমাংস দিয়ে গড়া যে দুনিয়াটাকে আমরা বাস্তব মনে করি, সেটা আসলে একটা মায়া। এর পেছনে আরেকটা জগৎ আছে যার একটা ক্ষীণ ছায়া আমাদের এই পৃথিবী। আসল ঘটনাগুলো ঘটে সেইখানে, আর তার প্রতিফলন আমরা আমাদের জগতে দেখতে পাই। যে সব মহাশক্তিধর অস্তিত্ব আড়াল থেকে আমাদের জীবন পরিচালনা করেন, তাঁরা সেই অন্য জগতে মূর্তিমান হয়ে ঘুরে বেড়ান। কোনো কোনো সময় আমরা সেখানকার দুই-এক ঝলক দেখতে পাই – সাধারণতঃ স্বপ্নের মধ্যে। কিন্তু সেখানে স্বেচ্ছায় কিছু করতে পারি না, মনে হয় কলের পুতুলের মতো যেন কার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি। আমি তোকে শেখাচ্ছি সাধনা ও মন্ত্রের সাহায্যে যোগনিদ্রার মধ্যে দিয়ে কী ভাবে ইচ্ছামতো সেই জগতে প্রবেশ ও বিচরণ করা যায়। আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতে কী ঘটছে, কেন ঘটছে তার রহস্য ওখানে গেলে অনেক সময় বোঝা যায়। প্রথম আবেশটা আমি তোকে করিয়ে দিচ্ছি। তার পরে সাধনায় যদ্দুর যেতে পারিস। আয় এদিকে।

[…]

ময়নাডিহি খালের কাছাকাছি মানুষের বাস নেই – শুধু জঙ্গলের মধ্যে বুনোদের দুই-একটা কুঁড়ে ঘর। গাছপালা দিয়ে ঢাকা ছায়াচ্ছন্ন এলাকা। বৈশাখ-জৈষ্ঠের চড়া রোদেও এখানকার মাটিতে আলো পৌঁছোয় না। কাছাকাছি গ্ৰামের শিশু ও কিশোররা এ দিকটা এড়িয়ে চলে। আমার ছোটবেলাতে মনে আছে মা বারণ করতেন এদিকে আসতে, কারণ জায়গাটা নাকি ভালো না। কেন ভালো নয় তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা কখনও শুনিনি। তবে ময়নাডিহি খালের জলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বেশ কয়েক বার। সেগুলো সব দুর্ঘটনা, না খুন, না আত্মহত্যা, তার নিশ্চিত ফয়সালা হয়নি কখনও।

[…]

মন্ত্রের জোরে প্রাণে মরব না জানি। কিন্তু মানসিক সুস্থতা বা বাকি জীবনটা ঘুমোতে পারার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার কোনো মন্ত্র আছে বলে শুনিনি কখনও। তবু এ রহস্য ভেদ না করে আমার উপায় নেই। পকেট থেকে দেশলাই বের করে একটা কাঠি জ্বেলে ছায়ামূর্তির মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। অন্য হাত দিয়ে তার ঘোমটা দিলাম সরিয়ে। সে আপত্তি করলো না।

[…]

এই সময় আমি টের পেলাম আমার একটা মৃদু অস্বস্তি হচ্ছে। তোমরা জানো মধুসুন্দরী দেবীর কৃপায় আমি কিছু ক্ষমতা পেয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা হলো, অতিপ্রাকৃতের উপস্থিতি আমি অনুভব করতে পারি, এবং সেই সংক্রান্ত কোনো অমঙ্গলের আগাম সঙ্কেত পাই। ভেবে দেখলাম, শ্যামাপদ যখন বলল ‘ফের এসেছিস’, তখন থেকেই এটা হচ্ছে। অনেকেরই এই অনুভূতিশক্তি সহজাত ভাবে থাকে, কিন্তু খুব কম মানুষই এর চর্চা করে। তোমার পেছন থেকে কেউ যদি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে, পাঁচটা সাধারণ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পাওয়ার কথা নয়। তবু যদি তুমি সংবেদনশীল হ‌ও, তোমার ঘাড়ের কাছটা শিরশির করবে, মেরুদন্ড বেয়ে একটা তরঙ্গ বয়ে যেতে থাকবে। কেন? কারণ এই মহাবিশ্বের রহস্য যদি হয় সমুদ্রের মতো অপার, তবে তার মধ্যে তোমাদের ইংরেজি বিজ্ঞান হলো এক ফোঁটা জলের সমান। বাড়িতে ঢোকার সময় থেকেই আমার মনে হচ্ছিল আড়াল থেকে কেউ আমাকে দেখছে। দেবীর বরে আমার এই বোধ খুব তীক্ষ্ণ, আজ পর্যন্ত ভুল হয়নি। এর কী ব্যাখ্যা দেবে তোমাদের বিজ্ঞান?

[…]

সত্যযুগে নচিকেতা যমরাজকে প্রশ্ন করেছিলেন, মৃত্যুর পরে মানুষ কোথায় যায়, আত্মার কি আদৌ অস্তিত্ব আছে? যম বলেছিলেন, নচিকেতা তুমি অন্য কিছু চাও। আমি তোমাকে অফুরন্ত সম্পদ দেব, ক্ষমতার শীর্ষে প্রতিষ্ঠা করব, পৃথিবীর রাজা করে দেব, অতিদীর্ঘ আয়ু দেব, সবরকম শারীরিক সুখ দেব। শুধু ঐ কথাটি জানতে চেয়ো না। কারণ জন্মমৃত্যুর রহস্য শুধু মানুষ নয়, আমি ব্যতীত অন্য সকল দেবতারও অজানা। সৃষ্টির সেই আদি যবনিকা, যার ওপারে তাকানোর অধিকার দেবতাদের‌ও নেই, দুটো আবোলতাবোল অং বং শিখে সেই পর্দা সরিয়ে দেখতে চেয়েছি কলিযুগে আমি তারানাথ চক্রবর্তী।

[…]

পাখি তারা নয়, কারণ তাদের দেহ ও ডানা বাদুড়ের মতো, চামড়ার তৈরি, এবং মাথাটা মানুষের। মানুষের বলতে দ্বিধা হচ্ছে, কারণ তাদের মুখে চোখে যে ভয়াবহ ক্রূর স্বার্থপরতা প্রকাশ পাচ্ছে তা কোনো মানুষের অভিব্যক্তি হতে পারে না, যত বড় নৃশংস শয়তান সে হোক না কেন। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা ঘাড় বেঁকিয়ে আমাকে দেখছে ও মাঝে মাঝে এক ধরণের তীব্র শব্দ করছে। রেলগাড়ির হুইস্‌লের আওয়াজ যদি এক সপ্তক চড়িয়ে দাও তা হলে যে রকম শোনাতে পারে অনেকটা সেই রকম।

[…]

দেখলাম কালো পাঁকের একটা অংশ ফুলে উঠছে। যেন একটা বিরাট বড় বুদ্বুদ এক্ষুনি উঠে এসে ফাটবে। কিন্তু বুদ্বুদ নয়। ক্রমশঃ কাদার একটা স্তম্ভ একটা মানুষের সমান উঁচু হয়ে দাঁড়ালো। তার পরে সেই আলকাতরার মতো ঘন কালো আঠালো পদার্থটা তার গা থেকে যত গড়িয়ে পড়তে থাকল, তত ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা মানুষের আকৃতি। এবং আমি তাকে চিনতে পারলাম।

[…]

এই কথাটা ভাবামাত্র মাথার ভেতরে যেন একটা বিদ্যুৎচমক খেলে গেল। নেপালী সাধু কেন স্বপ্নচারণ শিখিয়েছিলেন, বোষ্টম-বৌ কিসের অশনি-সঙ্কেত দিতে এসেছিল, শ্যামাপদ কেন ঐ কথাগুলো বলেছিল, এবং পাপাত্মাদের আসল উদ্দেশ্য, সব‌ই এক মুহুর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল। সেই সঙ্গে শৈশব থেকে সেই যে একটা প্রশ্ন আমার ছিল – বাবার চাবিটা দিয়ে কী খোলে – তার‌ও উত্তর পেয়ে গেলাম। এবং এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা পথ‌ যেন দেখতে পেলাম। এই পরাবাস্তবের রাজ্যেই আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে, এক্ষুনি।

Wednesday, 24 January 2024

The Mysteries

By Bill Watterson


Long ago, the forest was dark and deep.

There, shrouded in mists, lived the Mysteries.

Nobody had ever seen them, but they seemed to be everywhere. And the people lived in suspicion and fear.

To protect themselves, the people built enormous walls. And within those walls, storytellers told of the Mysteries' bizarre and terrifying powers. Artists depicted the people's many sufferings.

“If only we could be rid of these horrible Mysteries,” people whispered, glancing over their shoulders and hurrying on.

But every day, things happened for which there were no explanations.

These were frightful times.

Finally, the desperate King summoned his Knights and ordered them to capture a Mystery.

Perhaps the Mysteries’ secrets could be learned, and their powers could be thwarted.

So the Knights set off into the misty forest.

Year after year they searched.

Many Knights were never seen again.

But eventually, one dazed and exhausted Knight staggered back to the King.

A Mystery had been captured!

The public thronged to the great unveiling.

But the Mystery was nothing like what the ancient stories had led the people to expect.

The people were stunned.

The Mystery looked surprisingly ordinary.

Once understood, its powers were not all that remarkable.

And over time, each new Mystery they discovered was even less impressive.

Gradually the people stopped fearing the Mysteries.

They laughed at the old paintings.

Soon, the great wall was dismantled and the forest was cut down.

The people spread across the once-fearsome land.

The Mysteries vanished, and the people lived luxuriously.

They were finally in control of everything.

By and by, however, the sky turned a slightly weird color.

People wondered about it, but the King assured everyone that this was a perfectly normal variation.

Nevertheless, the wizards watched the horizon uneasily and made note of the strange creaks and shudders occurring far below in the ground.

Acrid smells drifted in from across the seas.

Sometimes flaming objects fell from the sky.

Animals started migrating to remote corners of the earth.

The scouring winds became more persistent.

And more and more often, things disappeared.

Rather late, the people grew alarmed.

Time moved on.

Centuries passed.

Eons passed.

The universe continued as usual.

And the Mysteries lived happily ever after.

******************************************

Disclaimer: I didn't write this. It was written by Bill Watterson, the guy who created Calvin & Hobbes. I liked it so much that I typed it and put it here so I could share it with you. I hope Bill doesn't sue me.

Buy the book if you can. It has nice pictures.

Monday, 22 May 2023

গোপালের বিপরীতবুদ্ধি

তর্করত্ন পন্ডিতের পুত্র গোপাল আকাট মূর্খ। বর্ণপরিচয় ও ধারাপাতের গন্ডি কোনোমতে টপকে আর এগোতে পারেনি। অবশেষে পন্ডিতমশাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, যে আর কিছু না পারে অন্ততঃ বংশরক্ষা করুক। গোপাল এখন রোজ সকালে পান্তাভাত খেয়ে লাঙল কাঁধে যায় বাপের জমি চাষ করতে।

ঢোকা-বেরোনোর পথটি পন্ডিতমশাইয়ের বৈঠকখানার সামনে দিয়ে। সেখানে তর্করত্ন মহাশয় দু'বেলা আড্ডা বসান তাঁর সমকক্ষ বন্ধুদের সঙ্গে – কাব্যতীর্থ, ব্যাকরণাচার্য্য, সিদ্ধান্তবাগীশ, তর্কপঞ্চানন, বিদ্যাভূষণ প্রমুখ। এঁদের মধ্যে কে বড়, এই নিয়ে রেষারেষি লেগেই থাকে। এখানে তর্করত্ন মহাশয় একটু বেকায়দায় থাকেন, কারণ তিনি নিজে দিকপাল পন্ডিত হলেও তাঁর ছেলেটিকে একবার নাম স‌ই করতে বললে সে তিনটি পেন্সিল ভেঙে ফেলে। সুতরাং এই জ্ঞানসমুদ্রের সামনে দিয়ে গোপাল যখন ঢোকে আর বেরোয় তখন এই সব সমকক্ষরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দীর দুর্ভাগ্যে মনে মনে উৎফুল্ল হ'ন এবং মুখে কপট দুঃখ প্রকাশ করে পন্ডিতমশাইকে ঠেস দিতে ছাড়েন না।

”বাবা গোপাল, তোমার পিতাঠাকুর এত বড় একজন পন্ডিত, কিন্তু তুমি বাবা সেই মূর্খ‌ই থেকে গেলে? বড় আফশোসের কথা।"

"বাবা গোপাল, তোমার বাবার কাছে সন্ধেবেলা বসে একটু কলাপ ব্যাকরণটা যদি অন্ততঃ প্রতিদিন দু'পাতা করে…"

"বাবা গোপাল, একজন মহামহোপাধ্যায়ের একমাত্র পুত্র কাঁধে লাঙল নিয়ে চাষ করতে যায়, দেখে বড় খারাপ লাগে। লঘুকৌমুদীটা যদি আরেকবার বাবার কাছে…"

পিতৃস্থানীয়দের তিরস্কার গোপাল মাথা নিচু করে শোনে, তার পরে ধীরে ধীরে মাঠের দিকে হাঁটা দেয়, বা ফেরার সময় হলে ঘরে ঢুকে যায়। গুরুজনদের কথার জবাব না দেওয়ার বোধটুকু অন্ততঃ তার আছে। কিন্তু তিল তিল করে বিরক্তি জমা হয় তার মনের ভেতরে। এই সব যখন ঘটে, তর্করত্ন মহাশয় তখন মুখ চুন করে বসে থাকেন। বাগ্মী হিসেবে খ্যাতিমান হলেও এই একটা সময়ে তাঁর বলার কিছু থাকে না।

এইভাবে বেশ কয়েক বছর চলে। গোপালের সংসার বৃদ্ধি পায়। তার মেজাজ‌ও এখন আর অতটা মোলায়েম নেই, কারণ নিয়মমতো যদিও পন্ডিতমশাই এখনও সংসারের কর্তা, তাঁর বয়স আশি ছাড়িয়েছে। আসলে গোপাল‌ই এখন সংসার চালায়। তার মধ্যে এখন একটা ভারিক্কে ভাব এসেছে। এই অবস্থায় রোজ গুরুজনের অযাচিত গঞ্জনা সহ্য করতে পারার কথা নয়। অথচ জ্ঞানসমুদ্রের কাছে সে খবর নেই। তাঁদের চোখে গোপাল সেই মূর্খ ছোকরাই রয়ে গেছে।

অত‌এব এক দিন গোপাল লাঙল কাঁধে বাড়িতে ঢুকছে, এমন সময় সিদ্ধান্তবাগীশ বলে উঠলেন – "বাবা গোপাল, এ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না বাবা। এত বড় একজন দিগ্‌গজ আচার্য্য তোমার পূজনীয় পিতাঠাকুর, আর তুমি কি না বাবা… আচ্ছা, তোমার বাবার কাছে বসে একবার অন্ততঃ গীতার সহজ অধ্যায়গুলি যদি…"

এত দিন পরে গোপালের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল। ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে পন্ডিতসভার দিকে আঙুল তুলে বেশ ধমকের সুরে খুব দ্রুত বলে উঠল –

"ধষেনি নমগনামগ যাদি রপৌরনে ইলা কেরেতিব্য মরফটপ্ল্যাঃ!"

বলে আর একটুও না দাঁড়িয়ে গটমট করে ভেতরে চলে গেল।

মেশিন গানের গুলি চললে যেমন লোকে মাথা নিচু করে দু'হাত তুলে ঠেকানোর অবাস্তব চেষ্টা করে, পন্ডিতেরা তেমন ভঙ্গিতে শব্দগুলো ঠেকাতে চেষ্টা করলেন। গোপাল চলে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ সবাই হতবাক। সবচেয়ে অবাক হয়েছেন গোপালের বাবা। প্রথম কথা ফুটল কাব্যতীর্থের মুখে – "বাপ রে!"

তার পরে একে একে সবাই ধাতস্থ হয়ে গবেষণায় বসলেন।

তর্কপঞ্চানন: "হ্যাঁ হে তর্করত্ন, গোপালকে সংস্কৃত শিখিয়েছ, ঘুণাক্ষরেও তো জানতে দাওনি?"

তর্করত্ন: "বিশ্বাস করুন দাদা, আমি একটি অক্ষর‌ও…"

সিদ্ধান্তবাগীশ: "রাতের দিকে নিয়ে বস বুঝি?"

তর্করত্ন: "আরে না না, আমি এ ব্যাপারে কিছুই…"

কাব্যতীর্থ: "তা এটা কি শূদ্রক থেকে বলল? কালিদাসের ভাষা তো এতটা কর্কশ হবে না। শূদ্রক নিশ্চিত। আর ন‌ইলে বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা।"

ব্যাকরণাচার্য্য: "কিন্তু অর্থ কী? ভাই বিদ্যাবিনোদ, একটু বুঝিয়ে বলো না।"

বিদ্যাবিনোদ: "কী জানি দাদা, আমার তো মনে হলো ব্যাকরণের কোনো সূত্র হবে। আপনিই ভালো বলতে পারবেন।"

ব্যাকরণাচার্য্য: "হ্যাঁ, চেষ্টা করলে পারব না কেন, নিশ্চয়ই পারব, শুধু ঐ প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা একটু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যেন পড়েছিলুম? বলো না হে সাংখ্যতীর্থ, কপিলমুনি প্ল্যাঃ সম্পর্কে কী বলেছেন?"

সাংখ্যতীর্থ: "আজ্ঞে কপিলমুনি প্ল্যাঃ প্রত্যয় বিষয়ে কিছুই বলেননি। এটা রয়েছে ত্রিমুনি ব্যাকরণের কাত্যায়নকৃত অংশে। আপনি বরং তর্করত্ন দাদাকেই জিজ্ঞেস করুন। পাণিনি-কাত্যায়ন-পতঞ্জলী ওঁর কন্ঠস্থ। তা ছাড়া শিক্ষা যখন উনিই দিয়েছেন…"

তর্করত্ন: "বিশ্বাস করুন মহোদয়গণ, আমি এ ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ… আর প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা আমার‌ও যেন কেমন একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে। পড়েছিলুম ছোটবেলায় ঠিকই…"

অতঃপর সকলে মিলে সিদ্ধান্ত হলো যে গোপাল রাত জেগে বাবার কাছে লেখাপড়া শেখে। বন্ধুদের চমকে দেওয়ার জন্য সে কথা তর্করত্ন কখনো প্রকাশ করেননি।

আড্ডার শেষে পন্ডিতমশাই গোপালকে ডেকে রহস্যটা জানতে চাইলেন। গোপাল একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে স্থানত্যাগ করল। বাধ্য হয়ে পন্ডিতমশাই পুত্রবধূর শরণাপন্ন হলেন।

"ব্যাপারটা একটু দেখ তো মা। বন্ধুদের সামনে আজ আমার খুব মুখোজ্জ্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এত সব ও শিখল কোথায়? বিশেষ করে প্ল্যাঃ প্রত্যয়টা কোথায় আছে যদি একটু জেনে দিতে পারো… কাল ওদের একটা জবাব তো দিতে হবে।"

রাতে শয়নকক্ষে গোপাল কঠিন জেরার মুখে পড়ল। বাপ-কাকাকে এড়িয়ে পালানো সম্ভব। বিছানা থেকে পালাবে কোথায়? কিছুক্ষণ অত্যাচার সহ্য করে সে বলতে বাধ্য হল।

"সকাল থেকে মোষের মতো খাটি, সে তো তোমাদের‌ই জন্য? সন্ধেবেলা দুটি জলভাত খেয়ে শুয়ে পড়ি, মড়ার মতো ঘুমোই। এর মধ্যে পড়ব কখন বল তো? কিছু না, শোনো আসল কথা। দু'মাস আগে তুমি বায়না ধরলে বাপের বাড়ি যাবে। তো আমাকেও যেতে হলো পৌঁছে দিতে। ফেরার সময় ট্রেন লেট। কোথায় না কি তার ছিঁড়েছে। পাক্কা দু'ঘন্টা স্টেশনে বসে বিড়ি ফুঁকছি আর মশার কামড় খাচ্ছি। মনটা বিরক্তিতে তেতো হয়ে আছে। পড়াশোনাও বিশেষ একটা জানি না যে খবরের কাগজ কিনে পড়ব। তখন দেখি একটা ফলকের গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে:

*প্ল্যাটফরম ব্যতিরেকে লাইনের উপর দিয়া গমনাগমন নিষেধ।*

কিছু করার ছিল না, তাই দু'ঘন্টা ধরে ওটাই উল্টো দিক থেকে মুখস্থ করে ফেললাম। কোনো কাজে লাগার কথা ছিল না, কিন্তু আজ মারাত্মকভাবে কাজে লেগে গেল। শুধু শেষে একটা বিসর্গ যোগ করে দিয়েছিলাম, যেমন সংস্কৃত ভাষায় অনেক শব্দের শেষে থাকে। কিছু জানি না, কিন্তু ছোটবেলা থেকে কানের কাছে শুনে তো আসছি!"


গল্পটা ছোটবেলায় শুনেছিলাম বাবার কাছে। একজনকে পড়ানোর জন্য আজ লিখলাম।

Saturday, 25 June 2022

রাঙা নদীর খেয়া



রাঙা নদীর পারে এসে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় ধরল এক শয়তান বুড়ো পাখি।

কোথায় যাচ্ছ?

– ওপারে।

কেন যাচ্ছ?

– বলব কেন?

ফেরা যায় না কিন্তু।

– সে জানি।

আপিং ক' পয়সার দেব?

– আপিং কেন?

ব্যথা লাগবে না।

কথাটা মন্দ বলেনি। চিনচিনে একটা ব্যথা তো আছেই। কেউ কোথাও নেই, টুক্ করে পকেটে ঢুকিয়ে নেব।

– দাও তা'লে এই টাকায় যতটা হয়।

কী দেব?

– কেন, আপিং?

আপিং নেই।

ব্যাটা ধুরন্ধর, অথবা পাগল। অথবা আবগারি দোকানের দাঁড়ে বসতো কোনো জন্মে, বুলিটা মনে রেখেছে।

অনেক বছর হয়ে গেল।

– কিসের?

কেউ ফেরে না।

– তাতে কী?

আপিং ক' পয়সার দেব?

– ধুস্।

গান শোনবা?

– কী গান জানো?

গলা ঝেড়ে নিয়ে পাখিটা শুরু করল – “কাঁটা লাগা! ঢিনচ্যাক ঢিনচ্যাক ঢিনচ্যাক, কাঁটা লাগা!”

– থাক থাক। বরং কৃষ্ণবিষয়ক হোক একটা। জানা আছে?

নেই আবার? এই শোনো। হরি দিন তো গেল, সন্ধে হল, এবার আমায় কাঁধে তোলো, জলদি চলো, জলদি চলো, ঐ দেখা যায় ঘাটের আলো...
 
– এ রকম তো ছিল না।

 কী রকম ছিল?

– ঠিক মনে পড়ছে না।
 
বাদ দাও। আর ক' মিনিট?

মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই, ঠিকই। শেষ চেকপোস্ট পেরিয়ে পেছনের সাঁকোটা জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছি, যাতে কেউ ধাওয়া করতে না পারে।

– চললুম।

– কেউ ফেরে না কিন্তু।

– ফিরে হবেটা কী? জিভে স্বাদ পাই না যে।

 রামনাম সথ্ হ্যায়। মা নেই তোমার?

কথা না বাড়িয়ে খেয়ায় গিয়ে উঠলাম। পাখিটা তখনও পেছন থেকে বলছে – ”ফেরা যায় না কিন্তু। আপিং ক'পয়সার দেব?"


Monday, 20 June 2022

On Life after Death

Since we started thinking, we've been afraid of death. It's instinctive, but also intellectual:

…the dread of something after death,
The undiscovere'd country, from whose bourn
No traveller returns…
(Hamlet Act III Scene 1)

The invention of religion was mostly in response to this, to assure us that there is life after death. It is unbearable to think of the loss of subjectivity, the annihilation of the consciousness and our inner world. Many religions tell us that death is only the destruction of the body, but not of consciousness (or soul, or whatever it's called). We turn to religion because we seek this consolation.

But is life after death really desirable? Is eternal consciousness a good thing? To me it sounds like insomnia. How sweet it is to sink into dreamless, deathlike sleep after a long day. Why would I want to stay up forever? Is it not better to dissolve into oblivion? Now if we could only get over this irrational fear of the unknown…

For in that sleep of death what dreams may come,
When we have shuffled off this mortal coil,
Must give us pause…