পুরনো কাগজ বাছতে গিয়ে একটা পত্রিকা পেলাম। নাম "অন্য কথা"। পলতা থেকে বেরোত, বছরে একটা, সম্পাদক শ্রী দীপক মিত্র। ওতে কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। ২০০১ সালের সংখ্যাটা খুঁজে পেলাম। পড়ে বেশ মজা লাগল – কেমন লিখতাম তখন। গুগ্ল লেন্স দিয়ে টেক্সট নিষ্কাশন করে এখানে দিলাম। এই সপ্তর্ষি চরিত্রটা নিয়ে আরও কয়েকটা লিখেছিলাম। যদি কখনও খুঁজে পাই, এখানে দেব। এই গল্পটার নাম "ভূতের সপ্তর্ষি দেখা"।
ভূতের সপ্তর্ষি দেখা
=============
তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়
একটা চাপা আতঙ্ক বুকে নিয়ে সপ্তর্ষির দিবানিদ্রা ভেঙে গেল।
কেউ বা কারা তাকে দেখছে।
ঘুমের আবেশ একটানে সরিয়ে দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসল। নাঃ, কেউ নেই তো! তার নিজের শোওয়ার ঘর, যেমনকার ঠিক তেমনই। এ ঘরে লুকোনোর জায়গা নেই একটুও। খাটের নীচেটায় ঠাকুমার আমল থেকেই সস্তা কৌটো-বাটার রাজত্ব। ওগুলোর মধ্যে কী আছে কেউ কোনোদিন খুলেও দেখে না। অথচ ওগুলো খুব দরকারি, এ রকম একটা অস্পষ্ট ধারণা বাড়ির লোকেদের মনে রয়েছে। সপ্তর্ষিও মনে করে, কখনও খুব আকাল পড়লে কিছু দুষ্প্রাপ্য তৈজসপত্র এখান থেকে উদ্ধার হতে পারে।
কিন্তু যতই জঞ্জালে ভর্তি হোক, কেউ কি চেষ্টা করলে ওখানে ঢুকে বসে থাকতে পারে না? এই ভেবে সপ্তর্ষি নীচু হয়ে খাটের তলায় দেখতে চেষ্টা করল।
কেউ নেই।
কিন্তু একটু অগোছালো লাগছে কি? ভাবতেই হাসি পেল ভয়ের মধ্যেও। অগোছালো লাগছে এই জায়গাটা? খুব গোছানো ছিল কি না!
তবু কী যেন একটা সমস্যা রয়ে গেছে? যেখানকার নোংরা কৌটো সেখানেই অবহেলিত হয়ে আছে, অথচ মনে হচ্ছে পুরো জিনিসটা যেন এইমাত্র কেউ নেড়েচেড়ে বসিয়ে দিল। সিনেমায় 'একটি নোংরা ও জঞ্জালময় খাটের তলা' দৃশ্যের সেট হুবহু প্রস্তুত। অন্য সময় এই জায়গাটা থাকে নেহাৎই ফালতু ও অপরিষ্কার, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অতি সন্তর্পণে কেউ এটাকে ফালতু ও অপরিস্কার করে তুলেছে। মাকড়সার জালগুলো এমন ভাবে হাতে টেনে-টেনে লাগানো, যাতে কেউ একটুও সন্দেহ না করতে পারে।
আর অপটু হাতে করতে গিয়ে অথবা পটুত্বের অহংকারে জিনিসগুলো বড্ড বেশী স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কোনো-কোনো চালাক দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিনেতা যেমন মঞ্চে স্বাভাবিকত্ব আনতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়, সেরকম ভাবে এগুলো এত মারাত্মক সাধারণ যে চোখের পড়ার মত হয়ে উঠেছে।
তার ঘরে কেউ এসেছিল এইমাত্র।
অথবা এখনো কেউ আছে।
সপ্তর্ষির গায়ে কাঁটা দিল। তাড়াতাড়ি জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কাউকে দেখা যায় কি না।
সাধারণ গলিটাই তাদের বাড়ির সামনের। বিজনবাবু রোজকার মত বিরক্ত মুখে বাজার যাচ্ছেন। জামরুলগাছে কাকটা বসে সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে আছে। সপ্তর্ষি ভাবল, তাহলে কি এ-ই? শেষ পর্যন্ত ওরা কাক পাঠালো নজরদারি করার জন্য? নাঃ। ওর মধ্যে সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি কোথায়? ওর চাউনি তো কালো পুঁতির মতো, ভাবলেশহীন।
ঘাড়ের ঠিক পেছনে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ হল।
প্রচণ্ড চমকে ও পেছন দিকে ঘুরতেই কে বা কারা যেন চোখের পাশ দিয়ে সাঁৎ করে সরে গেল।
“কে? কে? কোথায় গেল?” সপ্তর্ষি প্রবল বেগে ঘরের চারদিকে দেখতে লাগল। কিন্তু কোথায় দেখবে? তার ঘরে তো লুকোনোর জায়গা নেই কোনো।
তবে কি মনের ভুল? ঘুম কাটেনি এখনো? হতেও পারে। আর সত্যিই তো, তার ঘরে চুরি করার মত কিছু নেই। তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও খুবই সাদামাটা। এমন কোনো বিষয় নেই যার জন্য গোয়েন্দা লাগানো যেতে পারে অথবা যার থেকে গল্পের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।
আজ বিকেলে অবশ্য ঘুম থেকে উঠেই একটা ভূত-ভূত খেলা শুরু হয়েছে। পরিবেশে একটা নাটকীয়তা রয়েছে, যেন সে আসলে সাধারণ ছেলে সপ্তর্ষি নয়, কোনো গল্পে সাধারণ ছেলে সপ্তর্ষির ভূমিকায় অভিনয় করছে। আর তার সঙ্গে এই একটা অনুভূতি, যে তার মাথার ফুট দুয়েক পেছন থেকে কে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অসহ্য।
দুই-একবার সে বাঁই-বাঁই করে পাক খেয়ে দেখার চেষ্টা করল, ধরা যায় কি না। কোন লাভ হল না। কিন্তু প্রত্যেকবারই মনে হল, কালোমত কী একটা জিনিস পিছলে সরে গেল।
সপ্তর্ষির এবারে খুব রাগ হল। এ কী অন্যায় কথা! তাকে দেখা হচ্ছে, অথচ সে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না! এটা ঠিক নয়। কিন্তু কার কাছে নালিশ করবে, এ বিষয়ে অথারিটি কে, ঠাওর না করতে পেরে গোমড়ামুখে সে একতলায় নামল।
মুখে গোমড়া ভাব আর মনে চাপা ভয় নিয়ে যত নীচে নামল, তত তার অস্বস্তি আরও বেড়েই গেল। যতবার ঝটকা মেরে ঘাড় ঘোরাচ্ছে। ততবার দেওয়াল-দরজাগুলো যেন ধরা পড়ে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি নড়ে-চড়ে একেবারে সত্যিকারে দেওয়াল-দরজার মত হয়ে উঠছে। কজার ওপর খুলছে, বন্ধ হচ্ছে। চমৎকার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন আসলটি।
কিন্তু এই ফাঁকি সপ্তর্ষি ধরে ফেলল। তার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। ভূতের গল্প ও রহস্য উপন্যাস পড়ে-পড়ে সে একেবারে তুখোড় হয়ে উঠেছে।
এই সময় অবিকল সপ্তর্ষির মা এসে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য ভাবে যে একজোড়া তালশাঁস সন্দেশ দিলেন, সেগুলোর মত কৃষ্ণনগরের কারিগরও বানাতে পারবে না। এমন কি, খেতেও হুবহু এক রকম।
বাহাদুরী আছে বটে। একটুও বোঝাবার উপায় রাখেনি।
কিন্তু ওদিকে বৈঠকখানায় তার বড়কা আর ছোটবেলা-থেকে-বোবায়-ধরা ছোটকা (ঠিক যেন বড়কা আর বোবায়-ধরা ছোটকা) দাবা খেলতে-খেলতে চমকে এদিক-ওদিক দেখছেন, এটাও অনস্বীকার্য্য। যেন হঠাৎ ভূত দেখেছেন অথবা ভূত ওঁদেরকে দেখেছে।
এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপার সপ্তর্ষির পছন্দ হল না। এ সব বাড়ির পক্ষে অমঙ্গলজনক হতে পারে। আর বাড়িসুদ্ধ লোক সব সময় তটস্থ হয়ে থাকবে, এ-ও তো ভাল কথা নয়। তা ছাড়া নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে, আর ব্যক্তিগত ব্যাপারে বাইরের লোক এসে নাক গলাবে, এটা কি ঠিক? একটা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।
এই প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হয়ে সে ঝটিতি এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, যে দিকে মোড় নেওয়ার কথা নয় সে দিকেই হঠাৎ করে চলে গেল, আর মাঝে-মাঝে ফুট দুয়েক পেছনে হেলে পড়ে ছায়াটাকে অপ্রস্তুত ও পর্যুদস্ত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগল।
এবং এই পরিশ্রমসাধ্য চেষ্টা করতে করতে (যে সময়ে হুবহু তার বাড়ির লোকেরা অবিকল সন্দেহের চোখে সম্পূর্ণ সকারণে অত্যন্ত বিশ্বাস্য ভঙ্গিতে তার দিকে তাকাতে আরম্ভ করেছে) একবার ডান কাত হয়ে বাঁ দিকে চোখ নামাতেই কে যেন ভয় পেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
এই বার যাবি কোথায়? বাথরুমের দরজা তো একটাই।
সপ্তর্ষি একটুও ভয় না পেয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল এবং টেনে বের করে নিয়ে এল। জিনিসটা যদিও খুব পেছল, সপ্তর্ষির কোনো অসুবিধে হল না। এই ধরণের জিনিস কী ভাবে সামলাতে হয়, সেই তুক তার শেখা আছে। কানের গর্তে বাঁকানো কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে এল। বেচারির আর ট্যাঁ-ফোঁ করার জো রইল না। এ রকম শক্ত পাল্লায় বোধ হয় পড়েনি আগে কোথাও।
"কী নাম তোর? আমাদের ওপর নজর রাখছিস কেন?"
কড়া চোখে তাকিয়ে বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন করতেই কালচে মত জীবটা তিড়িং-তিড়িং করে লাফায় আর নার্ভাস গলায় বলে চলে, "পা-পা-পা-পা-পা-পা-পা........."।
"কীসের পাপাপা? বদমায়েসী হচ্ছে? চল তোকে পুলিশে দেব, নয়তো ওঝা ডাকব।
শুনে তো পদার্থটা ভির্মি খায় আর কি!
কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর জিনিসটার বোধশক্তি ও স্মার্টনেসের নিতান্তই অভাব দেখে সপ্তর্ষি একটু দয়াপরবশ হল।
"আচ্ছা, এ বারের মত ছেড়ে দেব ঠিক করলাম। কিন্তু এ রকম না বলে-কয়ে লোকের ঘরে ঢুকে পড়াটা কি ঠিক?"
জিনিসটা তিড়িং-তিড়িং করে লাফায় আর আতঙ্কিত গলায় বলে "না-না-না-না-না-না-না-না।"
"ঠিক বুঝেছিস। আচ্ছা, যাঃ।"
অভদ্র জন্তুটা ছাড়া পেয়ে কুমড়োর মত গড়াতে-গড়াতে আর ঢেঁকির মত লাফাতে-লাফাতে উধাও হয়ে গেল।
"চিন্তার কিছু নেই,” সপ্তর্ষি ভিতরে ঢুকে এসে বোবায়-ধরা ছোটকাকে অভয় দিল। "বেটা আর এ-পথ মাড়াবে না। নাম বলল পাঠক না কী। কোথা দিয়ে ঢুকল কে জানে।"
তাও একবার দেখে নিতে হবে আনাচে-কানাচে দুই-একটা রয়ে গেল কি না। ঘরবাড়ি ইতিমধ্যেই অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে এসেছে। সপ্তর্ষি ঠিক করল, দিনকতকের জন্য নিজের চাল-চলন ও কথাবার্তা আরও দুর্বোধ্য ও অপ্রত্যাশিত করে তুলবে। যদি খুব সাহসী দুই-একটা এখনও আড়াল থেকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ও বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে এতেই নিরস্ত হবে। বেটাদের বুদ্ধির যে বহর দেখা গেল!
********
“অন্য কথা” / ২০০১
অন্বর্থনামা। মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল।
ReplyDelete☺️🙏🏾
Delete